কয়েক কিলোমিটার উঁচুতে উড়তে ও প্রায় যাত্রীবাহী বিমানের সমান গতিতে ছুটতে পারে— রাশিয়ার নতুন দূরপাল্লার জেটচালিত ড্রোন। এই ড্রোন ইউক্রেনের দুর্বল হয়ে পড়া আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভকে লক্ষ্য করে দফায় দফায় এসব ড্রোন হামলা চালিয়ে আসছে মস্কো। প্রায় অবিরাম বিমান হামলার সতর্ক সংকেতের কারণে নগরজীবন অনেকটা অচল হয়ে পড়েছে।

রোববার ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি গত কয়েক দিনের আকাশ পরিস্থিতিকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের নতুন কৌশল হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ‘গত কয়েক দিনে আকাশে যে ভয়ংকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে’— তার জবাব দেওয়া হবে।

রাশিয়ার ২০২২ সালের আগ্রাসনের পর দ্রুত গড়ে তোলা ইউক্রেনের তুলনামূলক কার্যকর ও কম খরচের ড্রোন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য নতুন এসব ড্রোন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

ইউক্রেন দ্রুত ড্রোন প্রতিরক্ষায় বিশ্বের অন্যতম অগ্রণী দেশ হয়ে উঠেছে। এ প্রযুক্তি ভাগাভাগির জন্য পশ্চিমা ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের সঙ্গেও দেশটি চুক্তি করেছে।

তবে ইউক্রেনের বহুল প্রশংসিত ড্রোন প্রতিরোধ ব্যবস্থা প্রচলিত ড্রোনের বেশিরভাগই ধ্বংস করতে সক্ষম হলেও, নতুন জেটচালিত ড্রোনগুলো ঠেকাতে তাদেরকে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। এসব প্রচলিত ড্রোন সাধারণত অভ্যন্তরীণ বা ইন্টারনাল কম্বাশন ইঞ্জিনও প্রপেলার দিয়ে চালিত হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন ড্রোনগুলোতে চীনে তৈরি বিমানের মতো ছোট জেট ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়েছে। এগুলো পাঁচ কিলোমিটার উচ্চতায় ঘণ্টায় ৪০০ থেকে ৬০০ কিলোমিটার (২৫০ থেকে ৩৭০ মাইল) গতিতে উড়তে পারে। ইরানের তৈরি শাহেদ ড্রোনভিত্তিক আগের সংস্করণগুলোর তুলনায় এ গতি প্রায় তিন গুণ।

নতুন মডেলের ড্রোনে সর্বোচ্চ ৯০ কেজি বিস্ফোরক বহন করা সম্ভব, যা আগের সংস্করণগুলোর প্রায় দ্বিগুণ। এগুলো আকারেও অনেক বড়—দৈর্ঘ্য প্রায় ৬ মিটার ও ডানার বিস্তার ৫.৫ মিটার।

ইউক্রেনের সামরিক বিশেষজ্ঞ সের্গি জাগুরেটস এএফপিকে বলেন, এসব ড্রোনের উচ্চতা ও গতি ইউক্রেনের বর্তমান ড্রোন প্রতিরোধ ব্যবস্থার নাগালের বাইরে। এর ফলে ড্রোন মোকাবিলায় আমরা যে অগ্রগতি অর্জন করেছিলাম, তা অনেকটাই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে।’  

আকাশ প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন এসব ড্রোন প্রচলিত ড্রোনের তুলনায় ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ।

ধারণা করা হচ্ছে, আগস্টে রাশিয়া প্রায় ২ হাজার ৮০০টি জেটচালিত ড্রোন ছুড়েছে। জুলাইয়ে এই সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৫০০ এবং জুনে মাত্র কয়েক শ।

ইউক্রেনের বিমানবাহিনীর এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, এসব ড্রোনের প্রায় ৬০ শতাংশ ধ্বংস করা সম্ভব হচ্ছে। অন্যদিকে ধীরগতির ও কম উঁ”ুতে উড়া প্রচলিত ড্রোন ধ্বংসের হার ৯০ শতাংশের বেশি।

নতুন ধরনের ড্রোন হামলা এমন সময়ে শুরু হয়েছে, যখন গ্রীষ্মের শুরু থেকে রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ায় কিয়েভ এমনিতেই চাপে রয়েছে। এসব হামলায় বেশ কয়েকজন মানুষ নিহত হয়েছে।

শুক্রবার একটি জেটচালিত ড্রোন কিয়েভের ঐতিহাসিক কেন্দ্রস্থলে ইউক্রেনের নিরাপত্তা সংস্থার সদর দপ্তরে আঘাত হানে। দিনের বেলায় চালানো এই হামলাকে অত্যন্ত প্রতীকী আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ইউক্রেন অভিযোগ করেছে, শান্তি আলোচনা পুনরায় শুরুর চেষ্টা করতে মস্কো ও কিয়েভ সফরে থাকা মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের সফর ব্যাহত করতেই রাশিয়া এই হামলা চালিয়েছে।

দফায় দফায় হামলার কারণে কিয়েভ প্রায় অচল হয়ে পড়ছে। প্রতিদিন এক ডজন পর্যন্ত বিমান হামলার সতর্ক সংকেত বেজে উঠছে।

সতর্ক সংকেত জারি হলে অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। মেট্রোরেল চলাচলও সীমিত করা হয়। ফলে সড়কে ব্যাপক যানজট সৃষ্টি হয় এবং মানুষ রাস্তায় জড়ো হয়।